
ছগির হোসেন, কলাপাড়া//
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় প্রায় দু’বছর ধরে আশ্রয় কেন্দ্রে চলছে বিদ্যালয়ের পাঠদান। দু’দফা বণ্যায় বিধবস্ত হয়ে বিদ্যালয় ভবনহীন হয়ে পড়েছে মেনহাজপুর হাক্কানী মাধ্যমিক বিদ্যালয়। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অনুমতি নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। প্রতিনিয়ত দুর্ভোগে পড়ছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে পেতে নিজস্ব জায়গায় ভবন নির্মানের দাবি আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়া শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সরজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের তাহেরপুর গ্রামের শেষ সীমান্তে ওয়াপদা ভেরিবাঁধ সংলগ্ন মেনহাজপুর হাক্কানী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা ভবন ভেঙ্গে দুমড়ে মুচরে পড়ে আছে।
শিক্ষা গ্রহণের কোন পরিবেশ সেখানে নাই। ভবনহীন বিদ্যালয়ের জায়গাটি এখন একটি চত্বর মাত্র। ১৯৯৬ সালের জানুয়ারী থেকে বিদ্যালয়ের নিজস্ব ১ একর ১৬ শতাংশ জমির মধ্যে ৮০ শতাংশ জমির উপর টিন শেড নির্মাণ করে শুরু হয় নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম। ২০২৩ সালে মাধ্যমিক শিক্ষায় উন্নীত হয় এই প্রতিষ্ঠানটি।
বর্তমানে দুই শতাধিক শিক্ষার্থীদের নিয়ে চলছে বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম। তবে ২০০৭ সালে সুপার সাইক্লোন সিডরে ভেঙ্গে পড়ে বিদ্যালয়ের মূল ভবন। তখন সরকারিভাবে অনুদানের আড়াই লাখ টাকা দিয়ে ২৫০ ফুট লম্বা টিন শেড নির্মান করে পরিচালনা করেন শিক্ষা কার্যক্রম। এছাড়া বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে র্যামসহ সিড়ি, অফিস কক্ষ ও টয়লেট নির্মান করে দিলে ফিরে পায় শিক্ষার পরিবেশ।
পরে ২০১৯-২০ অর্থ বছরে সরকার ওই প্রতিষ্ঠানের জন্য “শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কাম একাডেমিক ভবন’ নির্মানের বরাদ্ধ হলেও ভবনের গাথুনি সংক্রান্ত বিষয়ে মাটির গুনাগুন ইতিবাচক না থাকায় তা বাতিল হয়ে যায় এরপর ২০২৪ সালের ঘূর্ণিঝড় রিমালের তান্ডবে ধবংস হয় বিদ্যালয়ের পাঠদানের টিন শেড কক্ষের মূল ভবন।
ফলে এখন আর তাদের পাঠদানের জন্য নিজস্ব কোনো ভবন নাই। পাশে থাকা ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়ন কেন্দ্রে শিক্ষা গ্রহণ করতে হচ্ছে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। প্রতিনিয়ত পাঠদানে দেখা দেয় বিভিন্ন ধরনের সমস্যা। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর শিক্ষা জীবন নিয়ে পড়েছেন অনিশ্চিত শঙ্কায়।
কবে ফিরে যাবেন তাদের আপন ঠিকানায়? এমন প্রশ্ন প্রতিনিয়ত। তাছাড়া জায়গা সংকটের কারনে একই শ্রেণিতে নেয়া হচ্ছে একাধিক শ্রেণির পাঠদান। আশ্রয়কেন্দ্রের দু’পাশ খোলা থাকায় বৃষ্টির দিনে বই-খাতা ভিজে নষ্ট হয়ে যায়। শুকনো মৌসুমে বৈদ্যুতিক পাখা না থাকায় সীমিত পরিসয়ে গাদাগাদি করে বসা শিক্ষার্থীরা গরমে অতিষ্ট হয়ে পড়েন।
এমনকি শীত মৌসুমে ঠান্ডায় কাবু হয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা বিভিন্নভাবে পানির কষ্টেও ভুগে থাকেন। দুই ঘূর্ণিঝাড়ে বিধবস্ত মেনহাজপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় এখন পুরোপুরি ভবনহীন। দ্রুত একটি ভবন নির্মাণ হলে নিরাপদ ও স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরে পাবেন বলে আশা করেন আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়া শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. রামিম বলেন, আমাদের এখানে স্কুলের ভবন না থাকার কারনে প্রতিদিন ক্লাস করতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে দুই দিক থেকে বৃষ্টির পানি ছিটকে বই খাতা বসার বেঞ্চ ভিজে যায়। এতে আমাদের খুব কষ্ট হয়।
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোসা. তানহা বলেন, আমি ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পুরনো স্কুলের টিন শেডে ক্লাস করেছি। ঘুর্ণিঝড় রেমাল বণ্যার কারনে আমাদের স্কুলের ভবনটি ভেঙ্গে যায়। এরপর থেকে কিল্লায় ক্লাস করছি। এখানে ক্লাস করতে আমাদের সমস্যা হয়। এক ক্লাসে অন্য ক্লাসের শব্দে আমাদের শিক্ষা গ্রহণে মনোযোগ থাকে না।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. মোবাশ্বের বিল্লাহ বিদ্যালয়ের দুর্দশার কথা ব্যাক্ত করে বলেন, এখানে ফ্যানের ব্যবস্থা না থাকায় গরমে অতিষ্ট হয়ে পড়ি। ছাত্র-ছাত্রীদের তখন অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়। আমরা যেখানে ক্লাস নিয়ে থাকি এখানে বণ্যাকালিন সময়ে মূলত গবাদি পশু রাখা হয়। তাছাড়া পানির অভাবে ছাত্র-ছাত্রীরা বাথরুমসহ হাতমুখ ধোয়ার কাজ করতে পারে না।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আশ্রাফুজ্জামান বলেন, ২০০৭ সালে প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় সিডরের প্রচন্ড আঘাতে আমাদের বিদ্যালয়ের ভবন’ বিধবস্থ হয়। বেসরকারি সংস্থা মুসলিম এইড একটি ঘর নিমান করে দিলে কোন রকম কার্যক্র চালাই। কিন্তু কোন পরীক্ষা নিতে পারছিলাম না।
তবে ঘুর্ণিঝড় রিমালের আঘাতে পুরো ভবন বিধবস্ত হয়ে গেলে সেখানে আর পাঠদান সম্ভভ না হওয়ায় তৎকালিন ইউএনও মহোদয়ের অনুমতি নিয়ে পাশে থাকা আশ্রয় কেন্দ্র কিল্লায় আশ্রয় নিয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।
এবিষয়ে ৫ নং নীলগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মো. নাহিদ হাসান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষন করে বলেন, আমি এই বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছি। দেখে এটি আমার কাছে ভয়াবহ অবস্থা মনে হলো। ক্লাস করার মতো কোন অবস্থা নাই। এখানে অনতিবিলম্বে শিক্ষা কার্যক্রম ও ক্লাস রুমের পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য একটি ভবন দরকার।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, মেনহাজপুর হাক্কানী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম আপাতত তাহেরপুর আশ্রয় কেন্দ্রে পরিচালিত হচ্ছে। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মানের জন্য ১ কোটি ৭০ লক্ষ টাকা বরাদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া প্রায় শেষের দিকে। বিদ্যালয়ের কাজ শুরু হলে আর কোন সমস্যা থাকবে না বলে তিনি জানান।