
কুয়াকাটা পর্যটকদের কাছে দিনদিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে কাউয়ারচরের ইলিশ-খিচুড়ী
কেএম খাইরুল ইসলাম সংগ্রাম
কুয়াকাটা থেকে। কলাপাড়া (পটুয়াখালী)
দেশের দক্ষিণের পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত। একই স্থানে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগের একমাত্র এই লীলাভূমিতে গিয়ে কাক ডাকা ভোরে সূর্যোদয় নিজ চোখে দেখবেন না এটা কিভাবে হয়। আর সূর্যোদয় দেখতে দেখতেই ট্যুর গাইডরা আপনাকে নিয়ে যাবে কাউয়ারচর এলাকায়। সেখানে লাল কাঁকড়া , বিশাল ম্যানগ্রোভ বন, চোখ জুড়ানো সৈকত, জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য দেখতে দেখতে চোখে পড়ে যাবে এক ঝাক মোটরসাইকেলের বেষ্টনী, কাছে যেতেই দেখা মিলবে দুচালা কয়েকটা টিনের লম্বা খাবার হোটেল তবে এগুলো দেখতে শুনতে খুব চাকচিক্য না হলেও এখানের তরুণ উদ্দোক্তা মিরাজ সিকদারের শুরু করা ইলিশ-খিচুরী বেশ কয়েকটি রেস্টুরেন্ট যেন আপনাকে স্বাদের পূর্ণতা এনে দিবে।
কুয়াকাটা সৈকত থেকে প্রায় ৮-১০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত কাউয়ার চর নামক স্থানটি বেশ জনপ্রিয় পর্যটকদের কাছে ভ্রমণ স্পট হিসাবে। পর্যটকদের আনাগোনা চাহিদার বৃদ্ধির কারণে গত ১২ বছর আগে এখানে ছোট চায়ের দোকান নিয়ে বসেন মিরাজ শিকদার নামে এক যুবক। প্রতিদিন সূর্যোদয় দেখতে পর্যটকদের আগমন বাড়তে থাকায় নতুন খাবার উপহার দেয়ার জন্য তিনি শুরু করেন ইলিশ-খিচুড়ী বিক্রি। শুরুর পর পরই তিনি এতে লাভের মুখ দেখতে থাকেন তার দেখাদেখি এখন সেখানে প্রায় ৮-১০ টি দোকান রয়েছে।
নতুন খাবারে পর্যটকদের মন রাখতে একপিস ইলিশসহ দুইপিস মাছ খিচুড়ি মাত্র ৫০-৬০ টাকায় আবার আপনার পছন্দের বড় জিনিস কিনে সবাই মিলে শেয়ার করেও খেতে পারেন। তারা সাথে দেন মাছের ভর্তা ফ্রি যা খেয়ে পর্যটকরা মুগ্ধ হন নিমিষেই। শুধু দামই নয়, সমুদ্র থেকে নিয়ে আসা জেলেদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা তাজা ইলিশ সাজানো থাকে থরে থরে যার যেটা পছন্দ সেটাই পর্যটকদের সামনে কেটে, মশলা মেখে, ভাজি করে দেয়া হয়, যা এই কুয়াকাটায় একমাত্র।
প্রতিদিন ভোর ৫টায় শুরু হওয়া এই নান্দনিক খাবার থাকে সকাল ৮টা পর্যন্ত এই সময়েই প্রতিটি দোকান বিক্রি করেন ৮ থেকে ১৫ হাজার টাকা। যেখানে লাভের পরিমাণ কম হলেও পর্যটকদের চাহিদা এবং সুস্বাদু খাবারের মান থাকে শতভাগ।
কুষ্টিয়া থেকে বেড়াতে আসা রবিউল ইসলাম বলেন, সকালে সূর্যোদয় দেখতে এসে দেখলাম থরেথরে ইলিশ মাছ সাজানো, সমুদ্রের পাশে তাজা ইলিশ সাথে খিচুড়ি সকালবেলা। আসলেই অনেক মজাদার ছিল, সকালের নাস্তাটাও হয়ে গেল আর সাথে তাজা ইলিশ নতুন একটা স্বাদও পেলাম অভিজ্ঞতা আসলে মনে রাখার মত।
আব্দুস সোবহান নামের আরেক পর্যটক জানান, আমরা মোটরসাইকেল ড্রাইভারদের কাছে শুনেছি যে তরতাজা সুস্বাদু ইলিশ এবং খিচুরি পাওয়া যায় সকাল বেলা। এখানে আসার পরে অনেকগুলো দোকান যাচাই-বাছাই করে দেখলাম যে আমাদের সাধ্যের ভিতর ইলিশ এবং খিচুড়ি পাওয়া যাচ্ছে। আমরা দুইটা বড় ইলিশ নিয়েছি একটা ২৩০ টাকায় একটা ৩৩০ টাকায়। দুটি ইলিশে আমাদের ৮ থেকে ৯ পিস ইলিশ হবে। আসলে আজকের এই আয়োজনটা এখানে পেয়ে আমাদের অনেক ভালো লাগছে।
ঢাকা থেকে আসা ফারজানা রহমান জানান, কুয়াকাটায় ভ্রমণেরনের অংশ হিসেবে কাউয়ার চরে এসে আমরা ইলিশ খিচুড়ি খুবই স্বস্তা দামে পেলাম। আমি ৯০ টাকার প্যাকেজটা নিয়েছি দুইটি মাছ একটি ভর্তা। এরকম সস্তায় আমার এলাকায় খাওয়া অসম্ভব। কম দামের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এত তাজা মাছ আমাদের এলাকায় কখনোই মেলে না।
কাওসার আহমেদ মতো অনেকের এই আয়োজনে অতিরিক্ত একটি নান্দনিক স্পট তৈরি হলো কাউয়ারচরে আর এতে করে পর্যটকদের বিভিন্ন স্পট দেখানোর ট্যুর গাইডরাও ভালো খাবারের আশ্বাস দিয়ে তা রক্ষা করা এবং সুন্দর একটি সকাল উপহার দিতে পেরেছে পর্যটকদেরকে।
ট্যুর গাইড মো. রাসেল হোসেন জানান, মূলত এখানেই তাদের এই আয়োজনটিকে আমরা স্বাগত জানিয়েছি। আমরা যখন পর্যটকদেরকে প্রতিটি স্পট ঘুরিয়ে দেখাই তার মধ্যে এটাও অন্যতম। এখানে সূর্যোদয় দেখার পরে এই ইলিশ খিচুড়ি খেয়ে পর্যটকরা অনেক আনন্দিত হয়। একসাথে তাদের সূর্যোদয় দেখাও হয় এবং সকালের নাস্তাটাও হয়ে যায়।
শুরুর দিন থেকে যে মান নিয়ে খাবার তৈরি করা শুরু করেছেন মিরাজ সিকদারেরা, সেই মান আর উন্নত করতে চান ভবিষ্যত দিনগুলোতে।
কাউয়ার চরের ইলিশ খিচুড়ির উদ্যোক্তা সিকদার রেস্টুরেন্টের মালিক মো. মিরাজ সিকদার বলেন, মূলত সাগরের পাড়ে পর্যটকরা সূর্যোদয়ের ঝাউবন, লাল কাকড়ার চর দেখতে আসে। এখানে এসে যদি তারা সমুদ্রের তাজা মাছ খেতে পারে তাহলে তার অনেক খুশি হয়। সেই জায়গা থেকেই তাজা মাছ এবং খিচুড়ি খাওয়ানোর উদ্যোগ জাগে আমার মধ্যে। এরপর থেকেই এটা আমি শুরু করে দেই, আমার দেখাদেখি অনেকগুলো দোকান এখানে উঠেছে, দোকান বেশি হওয়াতে আমাদের বেচা বিক্রি কমেনি বরং পর্যটকরা দেখে শুনে যাচাই বাছাই করে খেতে পারছে।
তিনি জানান, আমাদের তীরবর্তী এলাকার ছোট ছোট জেলেরা যে মাছগুলো ধরে নিয়ে আসে সেগুলো আমরা ক্রয় করি। এখানেই ক্রয় করে এখানে আবার পর্যটকদের সামনে বিক্রি করে দেই। তারা দেখে শুনে পছন্দ করে অর্ডার করে আর আমরা প্রসেসিং করে দেই। এর মাধ্যমে আমার এবং এক স্থানীয় বেশ কয়েকজনের যেমন পরিবার চলে তেমনি পর্যটকরা একটু সুস্বাদ এবং তাজা মাছ খেতে পারে এটা আমার কাছে অনেক ভালো লাগার।
আল্লাহ’র দান রেস্টুরেন্টের মালিক আ. রহমান জানান, সমুদ্র থেকে জেলেদের নিয়ে আসা ইলিশ, লাক্কা, কোড়াল, বাঁশপাতা, চিংড়িসহ ১০-১৫ আইটেমের সামুদ্রিক মাছ পাওয়া যাবে আমাদের কাছে এগুলো আমরা স্থানীয় জেলেদের সাথে কথা বলে সংগ্রহ করে রাখি পরে পর্যটকদের কাছে বিক্রি করি। এখানে এসে পর্যটকদের সময় কাটে শতভাগ আনন্দ উল্লাসে। এটাকে টিকিয়ে রাখতে এই এলাকাকে আরো উন্নত করার দাবি সরকারের কাছে।