সংবাদ ডেস্ক//
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার বিদায়ের পর দেশের শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল। তাদের প্রত্যাশা ছিলÑ এবার পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অবসান ঘটবে, বাজার হবে গতিশীল ও আস্থাভিত্তিক।
কিন্তু বাস্তবতায় সেই আশার প্রতিফলন দেখা যায়নি। ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সংস্কারের ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা গেলেও শেয়ারবাজারে তার কোনো ছোঁয়া লাগেনি। বরং পুরো বছরজুড়েই বাজার রয়ে গেছে স্থবির ও নিম্নমুখী।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি শেয়ারবাজারের লেনদেন শুরু হয়েছিল দরপতনের মধ্য দিয়ে। সেদিন মোট লেনদেন ছিল মাত্র ৩৩০ কোটি টাকা।
বছর শেষ হতে আর মাত্র দুই কর্মদিবস বাকি থাকলেও পুরো বছরজুড়ে বাজার কখনও থেমে থেমে, আবার কখনও লাগাতার দরপতনের মধ্যেই ছিল। অধিকাংশ বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজারে মুনাফার বদলে হারিয়েছেন পুঁজি।
হতাশার আরেকটি বড় দিক হলোÑ ২০২৫ সালে নতুন কোনো কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসেনি; পুরো বছর আইপিও কার্যক্রম ছিল ‘শূন্য’।
তবে সংশ্লিষ্ট মহলের আশা, নতুন বছরে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। বিনিয়োগ বাড়িয়ে বাজারে গতি আনতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিনিয়োগ সংস্থা আইসিবিকে নতুন করে এক হাজার কোটি টাকা ধার দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে সরকার।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, সর্বশেষ তিন কার্যদিবসের মধ্যে দুই দিন সূচক ঊর্ধ্বমুখী থাকার পেছনে আইসিবির সক্রিয় ভূমিকা ছিল।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন আমাদের সময়কে বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় পরিবর্তন আসবে।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরও বিএনপির শীর্ষ নেতা সরাসরি নির্বাচনের মাঠে না থাকায় কিছু সংশয় ছিল। তবে নির্বাচনী আবহ তৈরি হলে শেয়ারবাজার পরিস্থিতিরও পরিবর্তন ঘটবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জাতীয় নির্বাচন শেষে নতুন রাজনৈতিক সরকার অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নীতি গ্রহণ করবেÑ এমন প্রত্যাশাও সবার।
এদিকে বছরের শেষ দিকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার শূন্য ঘোষণার সিদ্ধান্ত।
ঋণ কেলেঙ্কারির পর দুর্বল হয়ে পড়া এসব ব্যাংক একীভূত করার প্রক্রিয়ায় শেয়ারহোল্ডারদের সব শেয়ার শূন্য ঘোষণা করা হয়। এতে এসব ব্যাংকের সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পুরো বিনিয়োগ হারান। পাশাপাশি আরও নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের ঘোষণায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বেড়েছে।
অতীতে শেয়ারবাজারে সংঘটিত নানা অনিয়মের ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের জরিমানা আরোপ করা হলেও বাস্তবে তা আদায় হয়নি। ফলে দায়ীদের কার্যকর শাস্তি হয়নি বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমান বিএসইসির নেতৃত্ব আইনি সংস্কারের মাধ্যমে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার বড় অংশই বাস্তবায়িত হয়নি। এর ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট আরও গভীর হয়েছে।
বছরের উল্লেখযোগ্য সময়জুড়ে বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের পদত্যাগ দাবিতে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ বিক্ষোভও করেছে।
বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছেÑ নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকের সংঘবদ্ধ দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার সুযোগেই অতীতে শেয়ারবাজারে নানা অনিয়ম হয়েছে।
কিন্তু এসব অনিয়ম রোধে কার্যকর সংস্কার উদ্যোগ দেখা যায়নি। বাজারের অংশীজনদের সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দূরত্ব এবং ‘নামমাত্র’ সংস্কার উদ্যোগ বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছে।
এমনকি বিএসইসির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও দূরত্ব তৈরি হয়েছে। বছরের শুরুতে কমিশনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী একযোগে কমিশনের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেছিলেন।
বর্তমান কমিশন মার্জিন ঋণ, মিউচুয়াল ফান্ড ও আইপিওÑ এই তিনটি বিধিমালার সংশোধনকেই শেয়ারবাজার সংস্কার হিসেবে তুলে ধরছে। এতে বাজারসংশ্লিষ্টদের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি শেয়ারবাজারে পড়ছে।
ডিএসইর ব্রোকারদের সংগঠন ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, শেয়ারবাজারের নেতিবাচক প্রবণতা কোনো এক বা দুটি ইস্যুর কারণে নয়। সার্বিকভাবে মানুষ বাজারের ব্যবস্থাপনায় হতাশ হয়ে পড়েছে।
সাধারণত জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে শেয়ারবাজারে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা গেলেও এবার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দুই সপ্তাহ পরও বাজারে দরপতন চলছে। এটি বিনিয়োগকারীদের হতাশার গভীরতা স্পষ্ট করে।
তিনি আরও বলেন, পাঁচটি ব্যাংকের একীভূত প্রক্রিয়ায় যেভাবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের নিঃস্ব করা হয়েছে, তা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। সরকার যদি আমানতকারীদের ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকার দায় নিতে পারে, তাহলে বিনিয়োগকারীদের ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার দায় নেওয়াও সম্ভব ছিল বলে তিনি মত দেন।