
সংবাদ ডেস্ক//
প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সড়ক, রেল ও নৌপথে যোগাযোগ বাড়াতে উদ্যোগ জোরদার করেছে বাংলাদেশ। রুট সম্প্রসারণের মাধ্যমে ট্রানজিট ও ট্রানশিপমেন্ট প্রক্রিয়া আরও গতিশীল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে আন্তঃদেশীয় রেল যোগাযোগে নতুন অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ের সংযোগের জন্য ৯টি ইন্টারচেঞ্জ পয়েন্ট রয়েছে। এ ৯টি পয়েন্টের মধ্যে ৬টি বর্তমানে চালু। বন্ধ ৩টি পয়েন্টের মধ্যে ১টি চালু করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। চালু ইন্টারচেঞ্জ পয়েন্টের মধ্যে দর্শনা (বাংলাদেশ)-গেদে (ভারত) ৩ কিলোমিটার। ইন্টারচেঞ্জ পয়েন্টটি ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের অংশ।
আন্তঃদেশীয় মালবাহী ট্রেনসহ দুই দেশের মধ্যে চলাচলকারী যাত্রীবাহী ট্রেন মৈত্রী এক্সপ্রেস ঢাকা-কলকাতা রুটে এ ইন্টারচেঞ্জ পয়েন্ট দিয়ে চলাচল করে। আরেকটি রুট বেনাপোল- পেট্রাপোল। দূরত্ব ১.৫ কিলোমিটার। স্বাধীনতার পর রুটটি সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও ২০০০ সাল থেকে মালবাহী ট্রেনের জন্য পুনরায় চালু হয়।
আন্তঃদেশীয় মালবাহী ট্রেনসহ যাত্রীবাহী বন্ধন এক্সপ্রেস খুলনা- বেনাপোল-কলকাতা রুটে এ ইন্টারচেঞ্জ পয়েন্ট দিয়ে চলাচল করে। সীমান্তবর্তী রহনপুর-সিঙ্গাবাদ রুটটি ১০ কিলোমিটারের। ১৯৯০ সাল থেকে
রহনপুর-সিঙ্গাবাদ রুট দিয়ে নিয়মিত মালবাহী ট্রেন চলাচল করছে। এ ইন্টারচেঞ্জ পয়েন্টের মাধ্যমে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের মধ্যে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করে।
আরেকটি রুট বিরল-রাধিকাপুর ১০ কিলোমিটারের। রুটটি ২০০৫ সালের ১ এপ্রিল থেকে বন্ধ ছিল। একটি প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ অংশে ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণ করা হয়। প্রকল্পটি সমাপ্ত হওয়ার পর ২০১৭ সালের এপ্রিলে বিরল-রাধিকাপুর সেকশন চালু হয়। এ পথে দুই দেশের মধ্যে মালবাহী ট্রেন চলছে।
এ ছাড়া চিলাহাটি-হলদিবাড়ি পথটি ৯ কিলোমিটার। ১৯৬৫ সালে পথটি বন্ধ হয়ে যায়। ২০২০ সাল উদ্বোধনের পর এটি চালু হয়েছে। আখাউড়া-আগরতলা রুটটি উদ্বোধন হলেও এখনও চালু হয়নি ট্রেন।
বন্ধ থাকা তিন রুট
বন্ধ ৩টি ইন্টারচেঞ্জ পয়েন্টের মধ্যে শাহবাজপুর-মহিশাসন রুটটি ১১ কিলোমিাটারের। ২০০২ সালের ৭ জুলাই বন্ধ হয়ে যায় রুটটি। এ পথটি চালু করার লক্ষ্যে এলওসি অর্থায়নের মাধ্যমে কুলাউড়া-শাহবাজপুর পুনর্বাসন নামে একটি প্রকল্প চলমান।
অবশিষ্ট ২টি বন্ধ ইন্টারচেঞ্জ পয়েন্ট হচ্ছেÑ বুড়িমারী-চেংরাবান্ধা (৩ কিলোমিটার) ও মোগলহাট-গিতলদহ (১১ কিলোমিটার। এদিকে নতুন ইন্টারচেঞ্জ পয়েন্ট চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ফেনী-বিলোনিয়া (প্রায় ৩৩ কিলোমিটার)। ফেনী থেকে বিলোনিয়া পর্যন্ত রেলপথটি ভারতীয় অনুদানে নির্মাণের প্রস্তাব ইআরডিতে পাঠানো হয়েছে।
নেপাল-ভুটান ট্রানজিটে অগ্রগতি
বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল কানেকটিভিটি : ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ, নেপাল ও ভারতের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়। সে অনুযায়ী বিরল, বাংলাবান্ধা, চিলাহাটি, বেনাপোল রুটে সব ধরনের পরিবহন ব্যবস্থায় আগমন ও বহির্গমন হতে পারবে। নেপালের সঙ্গে অন্য রুটের দূরত্ব বিবেচনায় ১৯৭৮ সালের ভারতের সঙ্গে বিরল-রাধিকাপুর ইন্টারচেঞ্জ রুটে নেপালের সঙ্গে ট্রানজিট ট্রাফিক পরিচালনার বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
এর ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সন পর্যন্ত বিরল-রাধিকাপুর ইন্টারচেঞ্জ রুটে নেপা ট্রানজিট ট্রাফিক পরিচালিত হয়ে আসছিল। পরে ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রহনপুর-সিঙ্গাবাদ রুট দিয়ে নেপাল ট্রানজিট ট্রাফিক পরিবহনের সিদ্ধান্ত হয়। এ দুটি রুট দিয়ে ভারতীয় ভূমির ওপর দিয়ে ট্রানজিট নিয়ে নেপালে পণ্য পরিবহন করা হয়।
এদিকে ভুটান স্থলবেষ্টিত হওয়ায় দেশটিতে কোনো সমুদ্রবন্দর নেই। ফলে বাংলাদেশের মাধ্যমে পণ্য নেওয়ার এই উদ্যোগ। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ভারতের ট্রানজিটের পরীক্ষামূলক তিনটি চালান খালাস হয়েছে আগে। সব মিলিয়ে ২০২০ সালের পর চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ট্রানজিটের চারটি চালান খালাস হলো।
বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যে সই হওয়া ‘এগ্রিমেন্ট অন দ্য মুভমেন্ট অব ট্রাফিক-ইন-ট্রানজিট’ চুক্তি ও প্রটোকলের আওতায় পরীক্ষামূলক চালানটি নেওয়া হচ্ছে। ২০২৩ সালের ২২ মার্চ এই চুক্তি ও প্রটোকল সই হয়েছিল। বাংলাদেশের মাধ্যমে শুরু হওয়া পরীক্ষামূলক চালান পরিবহনে দেশটি সন্তুষ্ট হলে নিয়মিত পণ্য পরিবহন শুরু হতে পারে।
তবে সেটি নির্ভর করছে ভুটানের আগ্রহের ওপর। ভুটানের চালানটি আনা হয়েছে থাইল্যান্ড থেকে। ৬ হাজার ৫৩০ কেজির এই চালানে রয়েছে শ্যাম্পু, শুকনা পাম ফল, আইস টি, চকোলেট ও জুস। চালানটির রপ্তানিকারক থাইল্যান্ডের অ্যাবিট ট্রেডিং কোম্পানি।
ট্রানজিট চালান খালাস প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা জানান, ভুটানের এক কনটেইনারের চালান থেকে সরকারি তিনটি সংস্থা ফি ও মাশুল আদায় করেছে। এর মধ্যে কাস্টমস বিভিন্ন মাশুল (মূসকসহ) হিসেবে পেয়েছে ৬৮ হাজার ৮৭৪ টাকা। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ পেয়েছে ১৬ হাজার ৭৯২ টাকা।
সব মিলিয়ে সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে ৮৫ হাজার ৬৬৬ টাকা। সরকারি কোষাগার ছাড়াও সরকারি সংস্থা বন্দর কর্তৃপক্ষ মাশুল আদায় করেছে ১৬ হাজার ৪৭ টাকা। জাহাজ থেকে কনটেইনার নামানো, ইয়ার্ডে স্থানান্তর ইত্যাদি সেবা বাবদ এই মাশুল আদায় করেছে বন্দর। সব মিলিয়ে সরকারি তিন সংস্থা ১ লাখ ১ হাজার ৭১৩ টাকা আয় করেছে এই ট্রানজিটের চালান থেকে।
ট্রানজিট চালানের কনটেইনার ২১ দিন বন্দরে বিনা ভাড়ায় রাখা যায়। এর বেশি সময় রাখা হলে ভাড়া দিতে হয়। তবে ভুটানের পরীক্ষামূলক চালানটি দুই মাসের বেশি সময় রাখা হলেও এ জন্য বাড়তি ভাড়া মওকুফ করা হয়েছে।