
বিনোদন ডেস্ক//
শিল্পী, সংগীত এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে আর আসবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর প্রপৌত্র সিরাজ আলী খান। গেল শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) ঢাকার ছায়ানট সংস্কৃতি-ভবনে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা ছিল তার।
আর সে কারণে ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় আসেন তিনি। কিন্তু বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে ছায়ানট প্রাঙ্গণে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া ঘটনায়- শিল্পী ও তার সহযোগীদের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। গতকাল রোববার এক ফেসবুক পোস্টে এমনটাই জানান সিরাজ আলী খান।
তিনি বলেন, ‘১৯ ডিসেম্বর ঢাকার ছায়ানটে আমার অনুষ্ঠান করার কথা ছিল। একই দিন ভোরে, একদল জনতা বাংলার অন্যতম সম্মানিত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট প্রাঙ্গণে আক্রমণ ও ভাঙচুর চালায়।’
বলা দরকার, বিশ্বখ্যাত সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর ছেলে আলী আকবর খান; তার সন্তান ধ্যানেশ খানের ছেলে সিরাজ আলী খান। তিনি মাইহার ঘরানার সংগীতের একজন খ্যাতিমান শিল্পী, থাকেন ভারতে।
এর আগে, গত ৮ অক্টোবর ঢাকার লালবাগ কেল্লায় ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর ১৬৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বর্ণাঢ্য আয়োজনের ধ্রুপদী সংগীতের অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিল সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। সেই অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করে প্রশংসিত হয়েছিলেন সিরাজ আলী খান।
সিরাজ আলী খান বলেন, ‘ভারী হৃদয়ে আমাকে স্পষ্ট করে বলতে হচ্ছে- শিল্পী, সংগীত এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপদ ও সম্মানিত না হওয়া পর্যন্ত আমি বাংলাদেশে আর ফিরব না।
এই সিদ্ধান্ত রাগ থেকে নয়, বরং দায়িত্ববোধ থেকে- আমার পরিবারের উত্তরাধিকার, আমার শিল্প এবং আমার নিরাপত্তার প্রতি। আমি এখনও বিশ্বাস করি, সংগীতের শক্তি আছে আরোগ্য ও ঐক্য গড়ে তোলার। আমি শুধু আশা করি, একদিন শিল্প ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান এতটাই ফিরে আসবে যে সেই সেতু আবারও গড়ে তোলা যাবে।’
তিনি বলেন, ‘আমি সবসময় আমার শিকড়ের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হতে বাংলাদেশে ফিরে এসেছি। আমার পরিবারের সংগীত, বড় বাবা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খানের ঐতিহ্য এবং মাইহার ঘরানার জীবন্ত উত্তরাধিকার ভাগ করে নিতে। আমি শুধু সংগীত, বিনয় ও শ্রদ্ধা নিয়েই এসেছিলাম।’
সিরাজ আলী খান বলেন, ‘জীবনে প্রথমবার, গভীর বেদনার সঙ্গে বলতে হচ্ছে আমরা আমাদের জীবনের জন্য ভয় পেয়েছি। আগে কখনো কল্পনাও করিনি যে বাংলাদেশে একজন ভারতীয় শিল্পী হিসেবে নিজের পরিচয় দেওয়াই আমাকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে। কোনোমতে নিরাপদে ভারতে ফিরতে পেরেছি- এর জন্য আমি কৃতজ্ঞ।’
তিনি আরও বলেন, ‘১৯ ডিসেম্বর যা ঘটেছে, তা শুধু সংগীতযন্ত্র বা একটি সংগঠন ভাঙচুর নয়, এটা “সংস্কৃতি, শিল্পী এবং যৌথ ঐতিহ্যের ওপর” আঘাত। সংগীত সবসময়ই আমাদের দেশ ও ইতিহাসের মধ্যে একটি সেতু ছিল। যখন সেই সেতু ভয় ও সহিংসতায় ভেঙে যায়, তখন আরও গভীর কিছু হারিয়ে যায়।’
ফেসবুক পোস্টে খ্যাতিমান এই শিল্পী বলেন, ‘আমার যন্ত্রণা একমাত্র সেই উন্মত্ত জনতার মানসিকতার বিরুদ্ধে, যারা সংস্কৃতি ও জ্ঞানের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আক্রমণ চালায়।
সংগীত ও শিল্প সবসময়ই রাজনীতি ও সহিংসতার ঊর্ধ্বে অবস্থান করে এসেছে আর সেগুলো যখন আঘাতের লক্ষ্যবস্তু হয়, তখন তা গভীরভাবে কষ্ট দেয়।’
বাংলাদেশকে ‘পিতৃভূমি’ হিসেবে বর্ণনা করে সিরাজ আলী খান বলেন, ‘যন্ত্রণা থেকে জন্ম নেওয়া সমালোচনা কখনোই প্রত্যাখ্যান নয়- এটি বরং উদ্বেগের প্রকাশ। আমি এখনো আশাবাদী যে প্রজ্ঞা, সংলাপ এবং সংস্কৃতির প্রতি সম্মানই শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে- যেমনটা এই মাটির দীর্ঘ ইতিহাসে বারবার হয়েছে।’
বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং শিল্পকলা একাডেমিকে ট্যাগ করে পোস্টে সিরাজ আলী লিখেছেন, ‘আমার এই পোস্ট সরকারের বিরুদ্ধে নয় কিংবা বাংলাদেশের সেই শিক্ষিত, সংস্কৃতিমনস্ক মানুষদের বিরুদ্ধেও নয়, যারা সবসময় আমাকে অসীম সম্মান ও ভালোবাসা দিয়েছেন।
ঢাকায় অতীতে যে উষ্ণতা ও ভালোবাসা পেয়েছি- বিশেষ করে একটি ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক পরিসরে আয়োজিত এক স্মরণীয় অনুষ্ঠানে, তা আমি কোনোদিন ভুলব না।’