
মো: মেহেদী হাসান ছাব্বির//
মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার বিশ্বব্যাপী পালন করা হয় ‘মা দিবস’। সেই হিসেবে আজ রবিবার (১১ মে) বিশ্ব মা দিবস।পৃথিবীর সব থেকে মধুর ডাক হলো ‘মা’। সন্তানের জন্য সব থেকে বেশি যে আত্মত্যাগ করতে পারে, সেই নামটিই হলো মা।মাকে ভালোবাসার জন্য বিশেষ কোনো দিনের প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন অনেকেই।কারণ প্রতিটি দিনই মাকে ভালোবাসার জন্য হওয়া উচিত।তবে প্রতিদিনের ভালোবাসাকে আরেকটু বাড়িয়ে বিশেষ করতে এই দিনটির গুরুত্বকে কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই। পৃথিবীর সব মায়েরাই বিশ্ব মা দিবসে সুখে থাকুক। সন্তান হিসেবে আমাদের সবার প্রত্যাশা এটাই।মাকে নিয়ে অনেক বিখ্যাত গান, কবিতা ও কালজয়ী উপন্যাস যেমন রচিত হয়েছে তেমনি ভাবে নির্মিত হয়েছে বিখ্যাত চলচিত্রও।মানুষের অভিধানে মায়ের চেয়ে সুমধুর আরেকটি শব্দ আছে কিনা আমার জানা নেই।
তথ্যসূত্র মতে, ১৯১২ সালে আনা বিভয় জাভিসকে মাদারডে’-র প্রবর্তক হিসেবে মনে করা হয়। ১৯১৪ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডড্রো-উইলসন প্রথমে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মে’ মাসের দ্বিতীয় রোববারকে ন্যাশনাল মাদার’ডে ঘোষনা করেন। আজ আমার স্মৃতির অ্যালবাম-এ আমার করুনাময়ী মমতাময়ী মায়ের মুখচ্ছবিটি বার বার ভেসে উঠছে।গানের ভাষায় “মধুর আমার মায়ের হাসি/মুক্তা হয়ে ঝরে/মাকে মনে পড়ে আমার মাকে মনে পড়ে। আমার মা হাসিনা বেগম রেবা। গায়ের রং ছিলো শ্যামলা, হালকা পাতলা গড়ন সাহসী- দূরদর্শী ও একজন সংসার সচেতন, মানবদরদী নারী ছিলেন আমার মা। আমার মায়ের চার সন্তানের মধ্যে আমি সবার ছোট। আমি ছিলাম মাতৃভক্ত এক নির্বোধ বালক। আমাদের সমাজ সংসারে দুষ্ট ছেলে ও নির্বোধ ছেলেদের প্রতি মায়েদের যথেষ্ট খেয়াল রাখতে হতো। একই ভাবে তারা কিছুটা উদিগ্ন ও থাকতেন। দুষ্টু ছেলেটা কোথায় কখন কি করে বসে, আর নির্বোধ ছেলেটা কখন বাড়ি ফেরে সারাটা দিন কোথায় ছিল, কি খেয়েছে এমন হাজারটা চিন্তা আমার মাকে আতঙ্কিত ও চিন্তাগ্রস্ত করে রাখত। বলতে দ্বিধা নেই আমি ছিলাম দ্বিতীয়টি অথাৎ মায়ের নির্বোধ ছেলে।আমার মা আমাকে আত্মীয়-স্বজনদের চরম অসহযোগিতা ও বিরাট প্রতিকূল পরিবেশে কিভাবে শিক্ষিত হিসেবে গড়ে তোলে ছিলেন যে দু:সহ কষ্ট ও বেদনা বিভূর দিন গুলোর কথা আমার এখনো মনে আছে।
১৯৯৪ সালে আমি যখন এস.এস.সি পরীক্ষা দেই তখন আমাদের সংসারে অভাব দেখেছি। টাকার অভাবে যখন আমার পরীক্ষার ফরম ফিলাপ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে তখন মা তাঁর হাতের এক জোড়া স্বর্নের বালা বন্ধক রেখে আমাকে ফরম ফিলাপ করিয়েছেন। এরপর এইচ.এস.সি ও ডিগ্রি পরীক্ষায় আমার অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে মায়ের ভূমিকা ছিলো অপরিসীম। পড়াশোনা শেষ করার পর আমার চাকুরির জন্য মা বিভিন্ন জনের কাছে ঘুরেছেন। প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন বলেছেন মায়ের হাসির চেয়ে সুন্দর কোন গোলাপ নেই, মায়ের দেখিয়ে দেয়া পথের চেয়ে মসৃণ কোন পথনেই। আমি সব কিছুর জন্য মায়ের কাছে ঋণী। তিনি আরো বলছেন, আমি যা কিছু পেয়েছি,যা কিছু হয়েছি এবং যা হতে আশা করি তার জন্য আমি আমার মায়ের কাছে ঋণী। একই ভাবে আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন বলেছেন, আমার শিক্ষা বুদ্ধিসত্তা ব্যক্তিত্ব নৈতিকতা ও সফলতার জন্য আমি আমার মায়ের কাছে ঋণি।”
বিখ্যাত আর্চবন্ড থমসন বলেছেন, মায়ের কোলের চেয়ে নরম কোন মখমলের কাপড় নেই। আমার মা একজন প্রতিবাদী নারী ছিলেন। পড়াশোনা না জানলেও ছিলেন রাজনৈতিক সচেতন। আমার মা তাঁর জন্মস্থান নগরীর কাটপট্টি রোড এলাকায় একজন মানবদরদী নারী হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত ছিলেন। নিজের খাবার অন্যের মুখে তুলে দিয়ে, নিজের বিছানায় অন্যকে ঘুমাতে দিয়ে তিনি মাটিতে রাত কাটিয়েছেন অনন্ত সময়। নিজের প্রতি খেয়াল না থাকায় একটা সময় মায়ের শরীরে নানা রোগ বাঁধতে শুরু করে। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে পড়েন শয্যাশায়ী। এরপর ২০২০ সালের করোনা মহামারির শেষ সময়টাতে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। সবশেষ ওই বছরের ১৮ মে আমাদের স্নেহ বঞ্চিত করে তিনি পাড়ি জমান না ফেরার দেশে।
আজ মা দিবসে মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা-হে আমার রব, হে আমার স্রষ্টা তুমি আমার মার প্রতি আজ এমন ব্যবহার কর যেমনি শিশুকালে তিনি আমার সাথে করেছিলেন।প্রতিবছর মা দিবস এলে মাকে নিয়ে পত্রিকায় কিছুনা কিছু লিখতাম। তারপর মায়ের কাছে গিয়ে তাঁকে সালাম করে তাঁকে নিয়ে কি লিখেছি তা পড়ে শুনাতাম। মা আমার লেখা দেখে প্রান ভরে আমার জন্য দোয়া করতেন। আজ পাঁচ বছর হয়ে গেলো আমি সেই দোয়া থেকে বঞ্চিত। হয়তো মা দূর আকাশে তারা হয়ে গেছেন। আজ চোখের অনেক কাছে থেকেও অনেক দূরে তিনি। ইচ্ছে হলেই তাঁকে জড়িয়ে ধরতে পারিনা। তবে আমার জন্য তাঁর ত্যাগ, আদর, সোহাগ, ভালবাসা অনুভব করি সবসময়। আমার মতো সকলেই একমত হবেন যে, একজন মা তার সন্তানের জন্য পৃথিবীতে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে কোন দ্বিধা করেননা।
মেডিকেল বিজ্ঞানের ভাষায় একজন মানুষ সর্বোচ্চ ৪৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যথা সহ্য করতে পারেন। কিন্তু একজন মা সন্তান প্রসব কালে ৫৭ ইউনিটের বেশি ব্যথা বেদনা সহ্য করে সন্তান প্রসব করেন। এ ব্যথাযন্ত্রনা এতটাই অসহনীয় যে,ডাক্তারী বিদ্যায় দেহের ১০টি হাড় এক সাথে ভেঙে যাওয়ার চেয়েও বেশী ব্যথা ও যন্ত্রনাদায়ক। পৃথিবীতে এ যন্ত্রনা-ব্যথা ও কষ্ট একমাত্র মাই সহ্য করতে পারেন। এ জন্যেই আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন কুপুত্র যদিবা হয়/ কুমাতা কখনও নয়’।
নোবেল বিজয়ী জার্মান সাহিত্যিক গুন্টার গ্রাম তার মৃত্যুর পূবেই এপিটাক লিখেগিয়েছিলেন তাতে আমার যখন মৃত্যু হবে আমার কবরের গায়ে যেন খোদিত থাকে এ ভাবে “এখানে শায়িত আছেন গুন্টার গ্রাম যে তার মাকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসতো”।