
বিনোদন ডেস্ক//
স্বপ্ন ছিল নির্মাণের। সেই স্বপ্ন বুননে মাঠ থেকে ঘাট, দেশ থেকে বিদেশ, ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি। কখনও পড়াশোনা, আবার কখনও নির্মাণ, এই দুই মিলে মাহাদী শাওন এখন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াতে বসবাস করছেন। হলিউডে নির্মাণের ঝোঁক থেকেই তিনি দিনকে করছেন রাত, রাতকে দিন।
দেশে সহকারী পরিচালক বা পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন দীর্ঘ ৮ বছর। এরপরই আন্তর্জাতিক মানের নির্মাণ শেখার আশায় তিনি পাড়ি জমান লস এঞ্জেলসে। গত ৪ বছরে তার সেখানকার গল্পই থাকছে আমাদের সময়ের পাঠকের জন্য।
মাহাদী শাওন: আসলে ঘটনা হচ্ছে অনেক আগে থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল হলিউডে এসে ফিল্ম মেকিং শিখব বা কাজ করব। সেই জায়গা থেকে আমেরিকায় আসব এটা স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্যই দেশ ছেড়েছি। ২০১৬ সাল থেকেই চেষ্টা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম যাতে আমেরিকায় আসতে পারি।
কিন্তু ব্যাক টু ব্যাক ৪ থেকে ৫ বার ভিসা প্রত্যাখ্যান হয়। তবুও হাল ছাড়িনি। একটু গ্যাপ দিয়ে আবারও ২০২১ সালে চেষ্টা করি ভিসার জন্য। এবার আর প্রত্যাখ্যান হইনি। ভিসা হয়ে যাওয়ার পরে হুট করেই দেশ ছেড়ে চলে আসি আমার স্বপ্নের আমেরিকায়।
মাহাদী শাওন: হ্যাঁ, একদম তাই। কিন্তু বাংলাদেশে নির্মাণে সুন্দর ক্যারিয়ার ছিল কী না, এটা নিয়ে আমি একটু কনফিউজড। নিজের ক্যারিয়ার শুরু করেছিলাম ঠিকই কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে আমার মনে হয়েছে যে, বাংলাদেশ থেকে যা শিখছি তা আসলে নির্মাণের জন্য পুরোপুরি না। আমি সেটিসফাইড ছিলাম না।
সেখান থেকে মনে হয়েছে যে হলিউড, যেটাকে মিডিয়ার আঁতুরঘর বলা হয় বা পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আন্তর্জাতিক অনেক কিছুই হয়। শিক্ষার মান, ফিল্ম নিয়ে গবেষণা, সবকিছুই এই হলিউড কেন্দ্রিক। বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের ফিল্ম নিয়ে ভাবনা খুবই কম। তো দেশ থেকে এখন হলিউডে শিখব, পরে দেশে কিংবা বিদেশে কাজে লাগাবো অভিজ্ঞতা। এটার উপর ভিত্তি করেই ক্যালিফোর্নিয়ার লস এঞ্জেলসে আসা।
মাহাদী শাওন: জ্বি, অবশ্যই হলিউডে শিখে আমি হলিউডেই কাজ করতে চাই। আন্তর্জাতিকভাবে তো যে কোনো জায়গায় কাজ করবোই। সেভাবেই এগিয়ে যাচ্ছি। এখন হলিউডের যে গিল্ড রয়েছে তার মেম্বারশিপ পেয়েছি। সোসাইটি অব ক্যামেরা অপারেটরসের মেম্বার ছিলাম। পরে ইনক্লুশন যে কমিটি রয়েছে তার মেম্বার হয়েছি।
টেলিভিশন একাডেমি, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মের মেম্বার। এর পাশাপাশি আমি ইউনিভার্সাল স্টুডিও, নেটফ্লিক্স, ফিল্ম ইন্ডিপেন্ডেন্টে ফিল্ম, ডিজনির সঙ্গে কাজ করেছি। তাছাড়া আরও অনেক সেটে কাজ করেছি। পাশাপাশি আমি একজন পেনাবাইজ্ড সার্টিফাইড সিনেমাফটোগ্রাফার, এসওসির মেম্বার, এভিড সার্টিফাইড এডিটর, দ্য ভিঞ্চি রিসলভ সার্টিফাইড কালারিস্ট।
এখন এই কাজগুলো করার মাধ্যমে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে বা হচ্ছে আমার তা দেশে থাকলে হয়তো হতো না। আসন্ন দিনে আমার হলিউডে নির্মাণের প্রতি যে ঝোঁক রয়েছে তা এই অভিজ্ঞতা অনেক কাজে লাগবে। এখানে হলিউডের কাজ করার জন্য আমার যে নেটওয়ার্ক তৈরি হচ্ছে, এটাই আমার পাওয়া। হলিউড অনেক বড় ইন্ডাস্ট্রি। এতো বড় ইন্ডাস্ট্রিতে অল্প অল্প করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। এখনও জানি না কবে কতটুকু করতে পারব। এখন পর্যন্ত বলা চলে শিখছি।
মাহাদী শাওন: বর্তমানে এখানে একটা ল ফার্ম, ডাউন-টাউন ল গ্রুপের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করছি। পাশাপাশি আমি ফিল্ম মেকিং নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ব্যাচেলর করছি। এর সঙ্গে আমার একটা প্রোডাকশন হাউজ আছে এসটুএস প্রোডাকশন, (এলএএলএলসি)।
এটার আন্ডারে ফ্রিল্যাংসিং ইন্ডিপেন্ডেন্টভাবে কমার্শিয়াল ফিল্ম এগুলো নিয়ে কাজ করছি। আমার একটা রেন্টাল হাউজ আছে, সেখান থেকে ফিল্ম ইনস্টুমেন্ট রেন্ট দিচ্ছি। এসব কিছু নিয়েই আসলে বর্তমান ব্যস্ততা আমার।
মাহাদী শাওন: আসলে আমি একজন একা মানুষ। তাই যখন যেখানে থাকি ওভাবেই মানিয়ে নিতে শিখে যাই। এখানে সময়ের খুব দাম। তাই খুব বেশি একা ফিল করতে হয় না। কাজের মধ্যেই জীবনের সময় পাড় হয়ে যাচ্ছে। তাই জীবনটা কেমন সেটা এখনও জানি না। জানার চেষ্টাও করছি না। শুধু আমার যে স্বপ্ন, সেটা নিয়েই ব্যস্ত আছি।
মাহাদী শাওন: এখানে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বলতে অনেক কিছুই আছে। যেগুলোতে যাওয়া আমার জন্য শিক্ষার, সেগুলোতে যাওয়া হয়। আবার আমি এখানে ফরেনার। সো, অনেক কিছুতেই নিয়ম মানতে হয়। আমার কলেজ বা ইউনিভার্সিটি থেকে অংশ নেই। তাছাড়া আমি যেহেতু এখানে মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত, তাই আমাদের সাংস্কৃতিক অনেক অনুষ্ঠানই থাকে। সো, বলা যায় মোটামুটি সব বিষয়েই অ্যাক্টিভ আছি
মাহাদী শাওন: অনেক অনেক ভাবনা রয়েছে আমার দেশের ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে। কারণ আমি ৮ বছরের উপরে বাংলাদেশে কাজ করে এসেছি। এখন প্রায় ৪ বছর হতে চলল দেশ থেকে মুভ করেছি। ৮ বছরে আমি যে কাজ করেছি বাংলাদেশে বা যা কিছু দেখেছি, তা এখানে কাজ শুরু করার পর বুঝতে পারলাম দেশের ফিল্ম মেকিংয়ের প্রসেসটাই ভুল।
তাই সেই জায়গা থেকে আমার ইচ্ছা আছে কাজ করার। ইতোমধ্যেই ডিরেকশন ফর ক্যামেরা (ডিএফসি) থেকে ইনিশিয়েট নিয়ে কাজ করছি। বাংলাদেশের পরবর্তী প্রজন্ম যারা ফিল্ম নিয়ে কাজ করবে, তাদের নিয়ে আমিও কাজ করতে ইচ্ছুক। এ ছাড়া ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্ম মেকিং করতে চায়, তাদের নিয়েও কাজ করব। যাতে করে তারা গ্লোবালি ভালো নির্মাণ কাজ করতে পারে।
কারণ তাদেরকে প্রোপার ওয়েতে ফিল্ম মেকিং নিয়ে শেখানোর জায়গাটা সুন্দরভাবে স্থাপন করতে চাই। অলরেডি এটা নিয়ে এখানে আমার কাজ শুরু হয়ে গেছে। হলিউডের ন্যাশনাল কমিউনিটি ডেভেলপমেন্টর আন্ডারে স্পন্সরশিপ পেয়েছি। যেটার মাধ্যমে হলিউড থেকে স্বাধীনভাবে ফিল্ম নিয়ে কাজ করার সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি।
তাই এটার মাধ্যমে বাংলাদেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে পরের প্রজন্মের ফিল্ম নির্মাতাদের জন্য কিভাবে ভালো করা যায় সেটা নিয়েও ভাবছি। আমি আমার জার্নিটা জানি। এটা কঠোর পরিশ্রম এবং খুবই চ্যালেঞ্জের কাজ। সে জায়গা থেকে মনে হয়েছে যে, আমি এখানে থেকে যা শিখছি বা হলিউডের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, এই রিসোর্সগুলো বাংলাদেশের ফিল্ম ডেভেলপমেন্টের জন্য ব্যবহার করতে চাই। এখানে হলিউডের গিল্ডের মেম্বার হওয়ার কারণে সব ধরণের সহযোগিতা পাই। স্পন্সরশিপ আছে। সব কিছু মিলিয়ে আমি চাই বাংলাদেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে নতুন করে ভাবা। এটাই আসলে আমার বাংলাদেশ নিয়ে পরিকল্পনা।