
ছগির হোসেন, কলাপাড়া//
পটুয়াখালীর গঙ্গামতি দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সমুদ্র সৈকত। পর্যটকদের কাছে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে ওই জায়গা। ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল দিয়ে সাজানো প্রাকৃতিক সৌন্দার্য্যে ভরপুর, বিশাল বেলাভূমি, একই জায়গা থেকে সূর্যোদ্বয় ও সূর্যাস্ত দেখার সুবিধা, দৃষ্টি নন্দন লাল কাকড়ার চর আর পায়রা বন্দরের মোহনা উপভোগ করার এক নৈসর্গিক স্পট গঙ্গামতি সমুদ্র সৈকত। পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার দাবি পর্যটক ও স্থানীয়দের।
পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার ৯ নং ধুলাসার ইউনিয়নের কুয়াকাটা পর্যটন নগরী থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার পূর্বদিকে অবস্থিত এই গঙ্গামতি সমুদ্র সৈকত। এখানে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য্যে ঘেরা নান্দনিক এক পর্যটন স্পট। শান্ত পরিবেশ, দূষণমুক্ত বালুচর আর গঙ্গামতির বন মিলিয়ে এক মনোরম পরিবেশ।
প্রতিদিনই বাড়ছে পর্যটকের আনাগোনা। বিশাল বালুচর আর অনাবিল নৈসর্গিকতা পর্যটকদের আকর্ষণ করে বলে সকাল বিকাল পর্যটকরা এখানে ভীড় জমায়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আর বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে গড়ে ওঠতে পারে দেশের দক্ষিনাঞ্চলের সবচেয়ে বড় এবং অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র।
আগত পর্যটকদের জন্য আবাসিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করলে রাতারাতি পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে এই জায়গাটি। ইতোমধ্যে গঙ্গামতি স্পটকে পর্যটন বান্ধব করতে উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন।
দীর্ঘদিন ধরে গঙ্গামতি সৈকতে প্রবেশদ্বারে ছোট খাল থাকায় যানবাহন নিয়ে পৌছাতে পারতো না পর্যটকরা। ইতোমধ্যে সেখানে একটি সেতু নির্মান করে দিলে অনায়াসে আসা যাওয় করতে পারে পর্যটকরাসহ স্থানীয় ও জেলেরা।
এতে সৈকতের সৌন্দার্য্য আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। উপজেলার ধূলাসার ইউনিয়নের চর গঙ্গামতি, গঙ্গামতি ও কাউয়ার চর এলাকা নিয়ে প্রায় ৩ কিলোমিটার জুড়ে প্রকৃতির হাতছোঁয়া এক শান্ত-নিঃশব্দ এক জায়গা।
স্পটটি রামনাবাদ চ্যানেলের মোহনা সংলগ্ন হওয়ায় একই জায়গা থেকে সূর্যোদ্বয়, সূর্যাস্তের পাশাপাশি পায়রা বন্দরের লাইটার জাহাজ দেখতে পাওয়া যায় বলে পর্যটকদের কাছে এ জায়গাটি দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে। এত সুন্দর একটি পর্যটন এলাকা হয়েও নেই যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিরাপত্তা, টয়লেট ও পর্যটনবান্ধব সুবিধা।
যথাযথ উদ্যোগ নিলে গঙ্গামতি হয়ে উঠতে পারে নতুন সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র, হতে পারে দেশের নতুন ট্যুরিষ্ট স্পট। তবে সম্ভাবনাময়ের ওই জায়গাটির রাস্ত-ঘাটের অবস্থা অনেকাংশে অবহেলিত। ফলে পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে পর্যটন বিকাশে অনেকটা বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।
এখানে পর্যটকদের রাত্রীযাপনের কোনো সুবিধা না থাকায়। সূর্য্য উদয় দেখতে কুয়াকাটা থেকে ভোর রাতে রওয়ানা দিতে হয় এখানে আসতে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রশাসনের নজরদারি করার মতো নেই কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা। তাই এখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হলে পর্যটকের সংখ্যা অনেক গুন বাড়বে পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে, সরকারের কোষাগারে জমা হবে বিপূল পরিমান রাজস্ব।
গঙ্গামতি ভবিষ্যতে পর্যটন শিল্পে রল্প নিলে কুয়াকাটা থেকে গঙ্গামতি পর্যন্ত পরিনত হবে বিশাল বাণিজ্যিক কেন্দ্রে। ফলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় পর্যটন কেন্দ্র গড়ে ওঠবে বলে মনে করেন পর্যটক ও স্থানীয়রা।
ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা পর্যটক মো. হেমায়েত উদ্দিন খান ও মোসা, ইসরাত জাহান খান দম্পত্তি বলেন, এর আগে কখনো এখানে আসিনি। অনেক জায়গায় ঘুড়তে গিয়েছি। কুয়াকাটায় আসার পরে জানলাম যে, খুব সুন্দর একটি জায়গা আছে। তাই দেখতে চলে এলাম। গঙ্গামতি ও কাউয়ার চর অনেক বড় জায়গা।
সিভিসও অনেক বড়। গাছপালা প্রকৃতি মিলে এক অসাধারন দৃশ্য। সিরাজগঞ্জ থেকে আসা পর্যটক মো. আসাদ উজ্জামান বলেন, এই এলাকায় এতো বড় সৈকত আছে তা অনেকেই জানে না। এখানকার দৃশ্য খুবই সুন্দর এবং দেখার মতো।
এখান থেকে পায়রাবন্দরের জাহাজ দেখা যায়, লাল কাকড়া দেখা যায় সব মিলিয়ে এখানকার পরিবেশ সুন্দর। স্থানীয় মোটর সাইকেল চালক, মজিবর রহমান বলেন, আমাদের এখানে পর্যটকদের রাতে থাকার জায়গা নাই। তাই কুয়াকাটা থেকে খুব ভোরে সূর্য্যদ্বয় দেখতে পর্যটকদের এখানে নিয়া আসি।
কুয়াকাটায় যত পর্যটক আসে সকালে বিকালে এই জায়গায় আইসা জমা হয়। তাদের এইখানে ঘোরতে ফেরতে ভালোলাগে। ভ্রাম্যমান ব্যবসায়ী মো. জাকির হোসেন বলেন, পর্যটকরা এসে নিশ্চিন্তে ঘোরাফেরা করে। আবার কুয়াকাটা চলে যায়। এই জায়গায় থাকার জায়গা থাকলে আমাগো অনেক বেচাকেনা হহতো।
ট্যুরিষ্ট পুলিশের কুয়াকাটা রিজিওয়ানের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান বলেন, কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা পর্যটকরা বিভিন্ন স্পটে বেড়াতে যায়। তবে সূর্য্যেদ্বয় দেখতে খুব ভোরে এখান থেকে গঙ্গামতি ভীড় জমায়। তাছাড়া গঙ্গামতি কাউয়ার চর এলাকার বিভিন্ন প্রাকৃতিক সৌন্দার্য্য উপভোগ করে থাকেন।
তাই আগত পর্যটকদের যাতে কোন সমস্যা না হয় এবং তাদের নিরাপত্তা দিতে ট্যুরিষ্ট পুলিশ গঙ্গামতি স্পটসহ সকল দর্শনীয় স্থানে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছে বলে তিনি জানান।
এ বিষয়ে কুয়াকাটা পৌর প্রশাসক মো. ইয়াছিন সাদেক জানান, গঙ্গামতি সিভিস অত্যন্ত দৃষ্টি নন্দন এবং ট্যুরিষ্টদের জন্য একটি নতুন আকর্ষন হিসেবে গড়ে ওঠেছে। আমরা চেষ্টা করছি এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নিরাপত্তার স্বার্থে অনেকগুলো উদ্যোগ বাস্তবায়ন করার।
কুয়াকাটা থেকে গঙ্গামতি পর্যন্ত যেতে ভেরিবাধের ওপরে এলজিইডির মাধ্যমে রাস্তা পাকাকরণ কাজ চলমান আছে । এই রাস্তাটি হলে ট্যুরিজমের স্বার্থে এটি অনেক উপকার হবে বলে আমি মনে করি।
তিনি বলেন, আমি ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী অফিসারের দায়িত্বে থাকা কালিন উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৩৮ লাখ টাকা ব্যায়ে একটি কার্লভাট নির্মান করেছি এবং এ্যাপ্রোজ সড়কও সম্পূর্ণ করে ফেলেছি। এখন ট্যুরিষ্টরা সরাসরি বীচে যেতে পারছে। সামনের দিকে গঙ্গামতিকে পর্যটক বান্ধব করতে আরো কাজ করার পরিকল্পনা আছে।
গঙ্গামতি সমুদ্র সৈকতকে পর্যটনবান্ধব হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ ও পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাউছার হামিদ বলেন, গঙ্গামিততে হিউজ পরিমান পর্যটক যাচ্ছে। ট্যুরিষ্ট যখন একটা স্পটে যায় তখন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা উপজেলা প্রশাসন বা সরকারের দায়িত্ব।
সেখানে আমরা ম্যাজিস্ট্রেট চৌকি করবো সিকিউরিটি পারপাসে ট্যুরিষ্ট পুলিশ বা লোকাল থানার বিষয়টি আমরা প্রায়ওরিটি দেব। যাতে পর্যটকরা নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগে। তিনি আরো বলেন, বীচ সংলগ্ন কোনো স্থাপনা করার বিষয়ে আদালতের নিষেধাজ্ঞা আছে।
গঙ্গামতি দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সমুদ্র সৈকত, মুগ্ধ পর্যটকরা তবে যারা বিনিয়োগকারী আছেন তারা ওয়াপদা রাস্তার ভেরিবাধের বাহিরে আশপাশে ব্যাক্তি মালিকাধীন জমিতে বিনিয়োগ করতে পারবেন। এটি একটি বড় ধরনের বিনিয়োগ খাত। অপার সম্ভাবনাময় একটি স্পট।
কুয়াকাটা থেকে পূর্বদিকের এই গঙ্গামতি সমুদ্র সৈকত প্রকৃতির এক অপার লীলাভূমি। অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে গঙ্গামতিসহ উপকূলের মানুষ। আর বিনোদন প্রেমীদের অন্যতম গন্তব্য হয়ে উঠবে এই গঙ্গামতি সমুদ্র সৈকত এমনটাই প্রত্যাশা করেন সকলে